শেখ রুবেল খাঁন রংপুর প্রতিনিধি।
গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুরে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানোসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ৬ স্তরের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েছে পুলিশ। কেন্দ্রগুলোতে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারির পাশাপাশি থাকবে পুলিশের বডিওর্ন ক্যামেরা।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে পুলিশ লাইন্সে পুলিশ সদস্যদের নির্বাচনী ব্রিফিং প্যারেড শেষে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফাত হুসাইন সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
এসপি মারুফাত হুসাইন বলেন, নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করতে জেলা পুলিশের আওতাধীন ৬৬৯ কেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েনসহ কেন্দ্রের বাহিরে ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স, সাব সেক্টর ও সেক্টর ভাগ করে ভোটার, ভোট প্রত্যাশী ও নির্বাচনে ব্যবহৃত সরঞ্জমাদির নিরাপত্তা দেওয়া হবে। কেন্দ্রগুলোতে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারির পাশাপাশি ৩১৫ কেন্দ্রে পুলিশের কাছে থাকবে বডিওর্ন ক্যামেরা।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের মাঠে পুলিশের পাশাপাশি দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী,বিজিবি,র্যাব, আনসারসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে। রংপুর জেলায় ৮৭৩ ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে জেলা পুলিশের আওতাধীন ৬৬৯ কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
মারুফাত হুসাইন বলেন, রংপুর জেলার নির্বাচনী পরিবেশ অত্যন্ত ভালো, এখন পর্যন্ত কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি। আমরা আশা করছি এটি বজায় থাকবে। সেই সাথে ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে যেতে পারেন সেটি নিশ্চিত করা হবে।
রংপুরে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ২১৬
জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে ৮৭৩ ভোটকেন্দ্রে এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ২১৬ কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাকি কেন্দ্রগুলো সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের মধ্যে রংপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১২১ ও আট উপজেলায় ৯৫ ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্র জানায়,ভোটার সংখ্যা বেশি,ইতোপূর্বে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর, সীমানা প্রাচীর না থাকা, প্রার্থী বা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবশালী নেতার বাড়ি সংলগ্ন কেন্দ্র, দূরবর্তী ও জনবহুল এলাকাসহ বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে এসব কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরপিএমপি) জানিয়েছে, রংপুর জেলার ৬টি সংসদীয় আসনের ৩টি আসনের আংশিক অংশে নির্বাচনী দায়িত্বে থাকবে মেট্রোপলিটন পুলিশ। এসব স্থানের ২০৪ কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনসহ ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে আলাদা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনী দায়িত্বে ৩০টি মোবাইল পেট্রোল টিম ও ৭৮টি স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ফোর্স কাজ করবে।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান বলেন, রংপুর জেলার সংসদীয় ছয়টি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০২ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১৩ লাখ ৬ হাজার ৩৩৩ জন এবং পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১২ লাখ ৯২ হাজার ৮৩৮ জন। হিজড়া ভোটার রয়েছে ৩১ জন। জেলায় মোট ৮৭৩টি কেন্দ্রে ৪ হাজার ৯৮৮টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ও স্বতন্ত্র মিলে ৪৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
প্রস্তুত সেনাবাহিনীর কমান্ডো গ্রুপ
এদিকে রংপুরে যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে সেনাবাহিনীর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডো গ্রুপ। নির্বাচনের দিন রংপুর বিভাগের প্রত্যন্ত এলাকার যেকোনো কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা ঘটলে তারা হেলি ড্রপ করে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করবেন।
চার জেলায় ৩ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন
এছাড়াও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও শান্তি রক্ষায় রংপুর বিভাগের ৪ জেলায় ৩ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
বিজিবির রংপুর সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল এসএম শফিকুর রহমান জানান, রংপুর সেক্টরের অধীনে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলায় ২৬টি বেজ ক্যাম্পে ৭৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবি সদস্যরা নির্বাচনি এলাকার নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও চেকপোস্ট স্থাপনসহ মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করছে। এসব জেলার ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশেষ নজর দিয়েছে বিজিবি।
নির্বাচনি এলাকায় নিরাপত্তা দিতে বিজিবির তল্লাশি কার্যক্রম চালু রয়েছে। এছাড়া ঝুঁকি বিবেচনায় বিভিন্ন স্থানে ডগ স্কোয়াড স্থাপন করা হয়েছে। টহল ও গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
এসএম শফিকুর রহমান জানান, রংপুর বিভাগের ৪টি জেলায় ২ হাজার ৫৭২টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ৬০০টি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র। এছাড়া জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিজিবির সমন্বয়ক টিমের প্রতিনিধিরা কাজ করছে।
এদিকে পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী ছাড়াও র্যাব, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে কাজ করছে।
বিশেষ করে চরাঞ্চল, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকা ও কোনো কোনো প্রার্থীর বাড়ির নিকটবর্তী কেন্দ্রগুলো নিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্র জানায়,এসব কেন্দ্রে অতীতে ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা, সংঘর্ষ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ এসব কেন্দ্রে এরই মধ্যে বসানো হচ্ছে সিসি টিভি। এ ছাড়া বাড়তি অস্ত্রধারী পুলিশ, আনসার সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। থাকছে ভিজিলেন্স টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স।
পুলিশের রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের আট জেলার ৩৩টি সংসদীয় আসনে ৩০টি পৌরসভা ও ৫৩৩টি ইউনিয়ন রয়েছে। এর মধ্যে ভোটকেন্দ্র চার হাজার ৫৪৬টি। অতিঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়েছে ৮২৭টিকে।
রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে। পুলিশ সদস্যদের শরীরে থাকবে বডিওর্ন ক্যামেরা, যার লাইভ মনিটরিং করা হবে ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে।
ঝুঁকিতে ২৫০০ কেন্দ্র, অতিঝুঁকিপূর্ণ ৮২৭টি
রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে এক কোটি ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫৬ ভোটারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে চার হাজার ৫৪৬টি ভোটকেন্দ্র। তবে এর মধ্যে দুই হাজার ৫৬১টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন।