রতন রায়হান, রংপুর প্রতিনিধি।
রংপুর কালেক্টর ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত বিএনপির নির্বাচনী জনসভা এক পর্যায়ে রূপ নেয় আবেগঘন স্মৃতিচারণ ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মঞ্চে। বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক এবং রংপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত মোজাফফর হোসেনের পরিবারকে বিশেষ সম্মান জানিয়ে মঞ্চে ডেকে নেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।গত শুক্রবার রাত ৯টার দিকে হাজারো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় প্রয়াত নেতার স্ত্রী সুফিয়া হোসেনকে মঞ্চে ডেকে তাঁর পরিবারের খোঁজখবর নেন তারেক রহমান। এ সময় জনসভাস্থলে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনেক নেতাকর্মীকেই চোখের পানি মুছতে দেখা যায়। তারেক রহমান প্রয়াত মোজাফফর হোসেনের রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম ও ত্যাগের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, মোজাফফর হোসেন ছিলেন বিএনপির দুঃসময়ের পরীক্ষিত নেতা। গণতন্ত্র, মানুষের ভোটাধিকার এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তিনি কখনো আপস করেননি। তার আত্মত্যাগ বিএনপির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি আরও বলেন, ত্যাগী নেতাদের পরিবারকে সম্মান দেওয়া বিএনপির রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। আমরা তাদের পাশে আছি এবং থাকবো।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর হোসেন স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বিএনপির রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সাহসী, স্পষ্টভাষী ও জনবান্ধব নেতা। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এই নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলনের কারণে তিনি রংপুরের সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। দলীয় কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি নেতাকর্মীদের মধ্যে আলাদা অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করত বলে জানান স্থানীয় নেতারা। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জেরে মোজাফফর হোসেনকে একাধিকবার হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০১৫ সালের ১৮ নভেম্বর। সেদিন নিজ বাসা থেকে সাদা পোশাক পরিহিত কয়েকজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য তাঁকে তুলে নিয়ে যান বলে পরিবারের অভিযোগ। এরপর টানা পাঁচ দিন তাঁর কোনো সন্ধান পাননি পরিবারের সদস্যরা। এই ঘটনায় রংপুরসহ সারাদেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ২৪ নভেম্বর তাঁকে একটি বিস্ফোরক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। ওই সময় বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে রংপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেন মোজাফফর হোসেন। নির্বাচনী মাঠে তাঁর জনপ্রিয়তা তখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। তবে জোটগত রাজনৈতিক সমীকরণ ও দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। দলীয় স্বার্থকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখার এই সিদ্ধান্তকে বিএনপির রাজনীতিতে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবেই দেখেন অনেক নেতা। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক চাপ, কারাবাস ও শারীরিক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় মোজাফফর হোসেনকে। অবশেষে ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৬৫ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে রংপুরসহ সারাদেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে। প্রয়াত নেতার মৃত্যুর পর ২০১৯ সালের রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশা করেন তাঁর স্ত্রী সুফিয়া হোসেন। যদিও সে সময় তিনি মনোনয়ন পাননি, তবে দলীয় রাজনীতিতে তাঁর সম্পৃক্ততা ও পরিবারের প্রতি বিএনপির সম্মান অব্যাহত রয়েছে। ঈদগাহ মাঠের জনসভায় তারেক রহমানের এই মানবিক উদ্যোগকে দলীয় নেতাকর্মীরা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। জনসভায় উপস্থিত বিএনপির নেতাকর্মীরা বলেন,
মোজাফফর হোসেন ছিলেন ত্যাগী ও সাহসী নেতা। তাঁর পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার মাধ্যমে তারেক রহমান প্রমাণ করেছেন বিএনপি ত্যাগীদের ভুলে যায় না। তারা আরও বলেন, এ ধরনের সম্মান ও স্বীকৃতি তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে এবং আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে দলকে আরও ঐক্যবদ্ধ করবে।